রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
দেখুন বন্যার পানিতে মাছ শিকারে উৎসবে মেতেছে জেলেরা লেবাননে ভয়াবহ ক্যামিকেল বিস্ফোরনের মত বড় ধরনের দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ করোনায় দিল্লিতে আটকা পড়া তাবলীগ জামাতের ১৪ সদস্য দেশে ফিরেছে মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু স্মরণে দোয়া ও মিলাদ পিরোজপুরে গৃহবধুকে হত্যার বিচারের দাবীতে পিতার সংবাদ সম্মেলন করোনায় আক্রান্ত মডেল সানাই স্বেচ্ছসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের পিতার মৃত্যু বার্ষিকীতে পিরোজপুরে দোয়া ও মিলাদ বন্যাকবলিত এলাকার দুঃখী মানুষের পাশে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা টিকটকে আপত্তিকর ভিডিও ছাড়ায় শাস্তির মুখে ৫ নারী এফডিসির সদস্যদের জন্য এবারও ৫টি গরু কোরবানি দেবেন অভিনেত্রী পরীমণি

করোনার প্রভাবে ঝালকাঠির ৩শ পাটিকর পরিবারের দৈন্যদশা

মোঃ আতিকুর রহমান,ঝালকাঠি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০
  • ১৩২ জন দেখেছেন

‘চন্দনেরি গন্ধভরা, শীতল করা, ক্লান্তি–হরা, যেখানে তার অঙ্গ রাখি, সেখানটিতেই শীতল পাটি’। ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘খাঁটি সোনা’ কবিতায় বাংলার মাটিকে এভাবে শীতলপাটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের শীতলপাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু যাঁরা এই শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত, বাংলার সেই পাটিকরদের এখন চরম দুর্দশা।

করোনার কষাঘাতে ঝালকাঠির ৩শতাধিক পাটিকর পরিবারের আগের মতো সচ্ছলতা নেই। আগের মতো বিক্রিবাটা নেই বলে তাঁদের বেশির ভাগই আর্থিক অনটনে রয়েছেন। ঝালকাঠিতে লকডাউন করার ফলে পাটি তৈরী করে রাখলেও ভরা মৌসূমে কেউ এখন পাটি কিনছেন না। তারপরও তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় টিকে থাকতে।

শীতলপাটি ঝালকাঠি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য। একটা সময় গরমের দিনে মানুষকে অনাবিল শ্রান্তি এনে দিতে শীতলপাটির কোনো জুড়ি ছিল না। মোর্তা বা পাটিবেত বা মোস্তাক নামক গুল্ম–জাতীয় উদ্ভিদের ছাল দিয়ে তৈরি করা হয় এই পাটি। কোথাও কোথাও এই পাটিকে নকশিপাটি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এই নিপুণ হস্তশিল্প শহর-গ্রামে মাদুর ও চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

দেশের উর্ধ্বতন কোন নীতি নির্ধারক বা কর্মকর্তা এবং বিদেশী কোন অতিথি আসলে জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য হিসেবে শীতলপাটি তাঁদের উপহার দেয়া হয়। হাতে বুনানো শীতল পাটির কদর সবার কাছেই। শীতলপাটি বুনিয়ে ৩শতাধিক পরিবারের হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন হয়ে ওঠে।
ঝালকাঠির সচেতন মহলের দাবী, সরকারের উচিত এই শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রণোদনা দেওয়া। পাটি বিক্রির মৌসুমে পাটিকরদের জন্য বিনা সুদে ঋণের কোনো ব্যবস্থা নেই বা তাঁদের পুনর্বাসনও করা হয় না। সরকারকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

জানাগেছে, রাজাপুর উপজেলার পাটিগ্রাম নামে পরিচিত হাইলাকাঠি। এগ্রামসহ পার্শবর্তি কয়েকটি গ্রামে ২শতাধিক পরিবার পাটি তৈরী করে জীবীকা নির্বাহ করে। বর্তমানে বিক্রির মৌসুম হওয়া সত্বেও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তৈরিকৃত শীতলপাটি বিক্রয় করতে পারছেন না পাটিকররা ।বছরে ফাল্গুন মাস হতে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত গরম কাল হওয়ায় পাটির চাহিদা বেশি থাকে । কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারনে শীতলপাটি বেচাঁ বিক্রি বন্ধ রয়েছে। করোনা ভাইরাসের ভয়ে খুচরা ও পাইকাররা আসতে পারছে না পাটি কিনতে। তাই বাজার প্রায় শূন্যের কোঠায়।

ঝালকাঠি জেলার গন্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমাদৃত এখানকার তৈরিকৃত শীতলপাটি। বংশ পরম্পরায় চলে আসায় পাটিকর কারিগরা অন্য পেশায় যেতে পারছেনা । তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হচ্ছে পাটি তৈরি করে বিক্রি করা । এ দিয়ে যা আয় হয় কোন মতে সংসার চালায় এবং বাচ্চাদের লেখা পড়া পিছনে খরচ করে থাকে সেই অর্থ। বাজারে এ দুরঅবস্থার কারনে পাটিকর পরিবার গুলো দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন কি ভাবে সংসার চালাবে তারা?

এমনিতেই বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি পাটি বাজারে ছয়লাভ হওয়ায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বাজার হারিয়ে ফেলছে। দিন দিন বাজার থেকে হারিয়ে যেতে বসছে শীতলপাটির চাহিদা । তপন ও বিজয় পাটিকর বলেন, সরকারি সহযোগিতায় অল্প সুদে ঋণ পেলে এবং সরকার বাজারজাত করণের উদ্যোগ গ্রহণ করলে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটির বাজার আবার ফিরে পাওয়া যাবে ।

মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদার বলেন, শীতল পাটির আগেরমত বাজারে চাহিদা না থাকায় পাটিকরা এমনিতেই মানবেতর জীবন যাপন করছে ,করোনা ভাইরাসের কারনে তারা আরো ক্ষতির মধ্যে পড়বে । আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতদুর সম্ভব তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।

পাটিকরদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, জেলার রাজাপুরের হাইলাকাঠিগ্রমসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে ৯০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৮-১০ বছরের শিশুরাও নিপুণ কারুকাজে পাটি তৈরী করে থাকে। এখানকার চিকনবেতির শীতলপাটির চাহিদাও প্রচুর। এ অঞ্চলে অতিথিদের সামনে একটি ভালো মানের শীতলপাটি বিছিয়ে নিজেদের আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পাটি শিল্প তাই বাংলাদেশের লোকাচারে জীবনঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান।

গরমের মৌসুমে এসব পাটি তাপে খুব বেশি গরম হয় না বলে একে শীতলপাটি বলা হয়। পাইত্রা বা মোর্তা নামে এক ধরনের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কাছ থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ক পাটি গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তারপর পাটির বেতি তোলা হয়। এরপর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির উপরের খোলস থেকে শীতলপাটি, পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ ছোটার (চিকন দড়ি) কাজে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ঝালকাঠি জেলায় তিনশ’র বেশি পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। এরা সবাই পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু হাতে গড়া শীতল পাটির জন্য এ গ্রাম দু’টিকে ‘শীতল পাটির’ গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমিজুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান।

এখানে শীতলপাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। পাটির বুনন পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমত, পাটির জমিনে ‘জো’ তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা তোলে। দ্বিতীয়ত, পাটির জমিন তৈরি হলে তার চতুর্দিকে অন্য রঙের বেতি দিয়ে মুড়ে দেয়। পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাটিকরদের পেশা এগিয়ে চলছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুণ একজন পাটিয়াল নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র।

একটি পাটি বুনতে ৩-৪ জনের দুই-তিন দিন সময় লাগে। যা বিক্রি করে পাঁচশ’ থেকে দেড় হাজার টাকা আসে। মহাজনরা প্রতি পাটিতে একশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকা লাভ করেন। পাইত্রা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এজন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওর কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পুঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। তাছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্তে¡ও এখন পর্যন্ত শীতলপাটি রফতানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি।

মঞ্জুরানী পাটিকর বলেন, ‘আমাদের শীতলপাটি দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থানে মেলা কিংবা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের অন্যকোন উপার্জন নেই। শুধু শীতলপাটি বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালাই। শীত এবং বর্ষায় আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। সরকার বিনাসুদে ঋণ দিলে বেশি পাইত্রা কিনে শীতলপাটি তৈরি করা যেত।’

১০ম শ্রেণির ছাত্রী মৌসুমি জানায়, তাদের পরিবারের সবাই পাটি বুনতে পারে। বাবা-মাকে সহযোগিতা করার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি পাটি তৈরি করেন। এতে বাবা-মাও তার প্রতি খুশি।
পাটি শিল্পী সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘সরকার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটি শিল্পীদের সরকারিভাবে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই খাতের আওতায় ঋণ দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ জন পাটি শিল্পীকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। তবে বিনাসুদে ঋণ দিলে আমরা উপকৃত হবো।’

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘চাহিদা থাকা সত্তে¡ও পাটি বিপণন ত্রæটি থাকায় বছরের একটি সময় তাদের বসে থাকতে হচ্ছে। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র্য কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র্য পাটি শিল্পীদের কাজের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হয়তো এটি অচিরেই সম্ভব হবে।’ করোনার কারণে পাটিকরদের পাটি বিক্রি বন্ধ থাকায় তাদের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

        


শেয়ার করুন

আরও সংবাদ পড়ুন
All rights reserved © 2020 prothinkbd (এই সাইটের নিউজ, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া কপি করা থেকে বিরত থাকুন)
Design & Developed By: NCB IT
11223
Shares